বিটকয়েন কি? বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে?

বিটকয়েন কি ? বিটকয়েন সমন্ধে জানতে চান? তাহলে শুধু গুগলে যেয়ে বিটকয়েন শব্দটাকে ইংরেজিতে Bitcoin হিসাবে লিখেই দেখুন। কি দেখলেন? যা দেখেছেন তাই। পৃথিবী একদিকে যেমন বিশ্বায়নের দিকে আরও ধাবিত হচ্ছে ঠিক তেমনি টাকা পয়সাও ভার্চুয়াল হয়ে আসছে। বিটকয়েন শব্দটার মধ্যেই কয়েন অংশটুকুই এর পরিচয় বলে দেয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি এর মধ্যে এক অন্যতম নাম এই বিটকয়েন যার দাম এখন ডলার কিংবা টাকায় কয়েক হাজার গুণ। বিশদের আজকের পর্বে তাই থাকছে বিটকয়েন সমন্ধে জানা অজানা তথ্যাবলি। জানতে সাথেই থাকুন।

বিটকয়েন কি?

বিটকয়েন-কে সচরাচর এক প্রকার ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। আর এই ডিজিটাল ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো এক প্রকারের ভার্চুয়াল মুদ্রা। অর্থাৎ বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই বটে তবে ইন্টারনেট জগতে এর বিপুল ছড়াছড়ি রয়েছে। বিটকয়েনকে বলা যেতে পারে অনলাইন জগতের টাকা। আর স্বাভাবিক মুদ্রার মতোই আপনি এই বিটকয়েন দিয়ে আপনার যাবতীয় জিনিসপত্র যেমন, খাবার, পোশাক কিংবা যা কিছুই বলুন সবই ক্রয় করা যাবে।

যদিও কিছু দেশে এখন এটা একবারে নিষিদ্ধ বলা যায়। অপরদিকে অনেক বিখ্যাত পেমেন্ট গেটওয়ে একে স্বীকৃতিও দিয়েছে। তন্মেধ্য পেপ্যাল, গত বছর অক্টোবরে এমনি একটি ঘোষণা করে যে, তারা বিটকয়েনকে স্বীকৃতি দিবে। ছবিতে যেই বিটকয়েন দেখা যায় তা শুধু ছবি। বিটকয়েন ভ্যালিড হতে গেলে বা এর মূল্যের জন্য দরকার কিছু কোড এর যা এর ভিতরে ইনক্রিপটেড থাকবে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি এর একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ

ক্রিপ্টোকারেন্সি এর ইতিহাস বলতে মূলত বিটকয়েন এর ইতিহাসকেই বুঝানো হয়। কেননা এই বিটকয়েন আসার পরই ক্রিপ্টোকারেন্সি সমন্ধে মানুষ পরিচিত হয়। আর এই ইতিহাসটাও খুব বেশিদিনের নয়। মাত্র ১২ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৯ সালে প্রথম এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। আর ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো নামক এক ব্যক্তির হাত ধরে এই পিয়ার টু পিয়ার মুদ্রা ব্যবস্থা আমাদের মাঝে চলে আসে। যদিও সাতোশি নাকামোতো নামটি একেবারেই ছদ্মনাম।

তবে এই প্রকাশের কিছু আগে থেকেই বিটকয়েন নিয়ে পৃথিবীকে সচেতন করে যাচ্ছিলো উক্ত যুবকতার প্রথম প্রভাবটা পড়ে ২০০৮ সালের ১৮ই আগস্ট। সে সময় Bitcoin.org নামে একটি ডোমেইন নিবন্ধন করে সে। এরপর একে একে বিটকয়েন মাইন হয়, নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।

আর সাতোশি নাকামোতো অবস্থা কিছুটা বেগতিক বা হ্যাকিং এর প্রচেষ্টা হচ্ছে দেখতে পেয়ে সর্বশেষ তা গ্যাভিন অ্যান্ড্রেসেন নামক এক সফটওয়্যার ডেভলপার এর কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে সাতোশি আর পদ্মার সামনে আসেননি। আর এই দিকে বিটকয়েন এর সার্বিক দায়িত্ব এসে যায় গ্যাভিন এর হাতে।

বিটকয়েন এর ইতিহাস বলতে গেলে এর মূল্যের ইতিহাসটাও সামনে নিয়ে আসতেই হয়। সেই ২০০৯ সালের বিটকয়েন এর মূল্য আর এখনকার বিটকয়েন এর মূল্যে রয়েছে আকাশ পাতাল তফাৎ। তা একটু পরিসংখ্যান দেখলেই চোখে আসে।

২০০৯ সালে একটি বিটকয়েন এর দাম ছিল ০.০০০৮ ডলার। অর্থাৎ আপনি ১২৫০ টি বিটকয়েন এর বিনিময়ে কেবল এক ডলার কিনতে পারতেন সেই সময়টাতে। কিন্তু এরপরেই শুরু হয় বিপ্লব। সেই বিপ্লবের যে আর থামার নাম গন্ধও নেই। ঠিক তখন থেকেই বেড়ে বেড়ে আজ একটি বিটকয়েন এর মূল্য প্রায় ৬০০০০ ডলারেরও বেশি। বাংলাদেশি টাকায় এর মান তাহলে কত হচ্ছে জানা উচিত কি? হ্যাঁ, সেই মূল্যটা হলো ৪৪ লক্ষ টাকা ছাড়িয়েছে এই বিটকয়েনের দাম।

আরো পড়ুনঃ  জিপিএস কি (GPS) কিভাবে কাজ করে?

আর এই পরিসংখ্যানের কথা এনেই আপনাকে আফসোস করানোর একটি প্রতিবেদন কিছুদিন আগে করে প্রথম আলো। আমরাও আজ আরেকবার আপনাকে বলতে চাই।

বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে?

প্রত্যেকটা বিটকয়েনই মূলত এক একটি কম্পিউটার ফাইল বা প্রোগ্রাম। আর এই বিটকয়েন সংরক্ষিত মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের ডিজিটাল ওয়ালেটে। এর মাধ্যমে কেউ যেমন আপনার ওয়ালেটে বিটকয়েন পাঠাতে পারবে ঠিক এমনিভাবে আপনিও অন্যদের ওয়ালেটে বিটকয়েন পাঠাতে পারবেন খুব সহজেই। আর বিকাশ কিংবা নগদের মতো এই ট্রান্সজেকশন এর হিস্ট্রিও লিপিবদ্ধ করা হয়ে থাকে। আর তাই আপনি যদি ভেবে থাকেন যে বিটকয়েন-এ নিরাপত্তা নেই৷ তাহলে ভুল করছেন। ব্লকচেইন নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিটকয়েন আদান প্রদানের হিসাব রাখা হয়। আর এর মাধ্যমে কেউ যদি বিটকয়েন এর কপি বানাতে চায় তবে সে ব্যর্থ হবেই। কেননা এখানে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত কড়া।

আর বিটকয়েনকে বলা হয়ে থাকে পিয়ার টু পিয়ার মুদ্রা ব্যবস্থা। তা এই জন্য এর লেনদেন এর জন্য কোনো মুদ্রা বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে মধস্থ্যতাকারী হিসাবে প্রয়োজন নেই। তাই একে ওপেন সোর্সও বলা হয়ে থাকে অনেক সময়।

মানুষ কিভাবে বিটকয়েন এর সান্নিধ্য পাবে?

বিটকয়েন কি বা বিটকয়েন পাওয়ার জন্য প্রধানত তিনটি উপায় রয়েছে। সেগুলো হলো: ১. আপনি প্রকৃত অর্থের টাকা দিয়ে বিটকয়েন কিনে ফেলতে পারেন। ২. নিজের কোনো জিনিস বিক্রি করে মানুষকে বিটকয়েন দ্বারা পেমেন্ট করার কথা বলতে পারেন। ৩. আর এই বিটকয়েন কম্পিউটার ফাইল হওয়ায় তা কম্পিউটারেই বানানো যায়। বিটকয়েন বানানোর সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয়ে থাকে মাইনিং। একটু পরেই আমরা তা জানব।

বিটকয়েন ও তার শত্রুরা

হেডিং দেখে বিচলিত হওয়ার কিছুই নেই। এখানে মূলত বুঝানো হচ্ছে যে বিটকয়েন শুধু একাই নয়। এর আরও ভাই বোন রয়েছে। আপনাকে মনে রাখতে হবে যে বিটকয়েন একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি আর ঠিক এরই মতো আরও ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে। সংখ্যায় এরা প্রায় ১০০০ এর মতো। বিটকয়েন যেমন হঠাত করে উঠে এসেছে ঠিক তেমনি এরাও উঠে আসতে পারে।

যদিও সেই ক্রিপ্টোকারেন্সি এর ভবিষ্যত খুব সুনিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। তারপরও নানা রকমের এই ভার্চুয়াল মুদ্রা এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে ভবিষ্যতে এগুলোর মাধ্যমে আমাদের অর্থনৈতিক লেনদেন হয়ে যেতে পারে একেবারেই ভার্চুয়াল।

বিটকয়েনের পরপরই আপনি বাকি যেই ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোর নাম খুঁজে পাবেন তা হলোঃ

ইথেরিয়াম, ড্যাশ, বাইটকয়েন, ডোজকয়েন, লাইটকয়েন , রিপল , মোনেরো । এছাড়াও আরও অনেক ক্রিপ্টোকারেন্সি উঠে আসছে তাদের উদ্যোক্তাদের হাত ধরে।

বিটকয়েন লেনদেন যেভাবে হয়ে থাকে

বিটকয়েন একধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি আর তাই এর লেনদেন পদ্ধতিও ক্রিপ্টোকারেন্সি এর মতোই হয়ে থাকে। আর একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি যেহেতু অস্তিত্ববিহীন মুদ্রা তাই কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর মাধ্যমে এর লেনদেন সম্ভব নয়। এর লেনদেন একেবারে পিয়ার টু পিয়ার অর্থাৎ প্রেরক পাঠালে তা একেবারে প্রাপকের কাছেই পৌছাবে। তবে এর মধ্যেও কিছু বিষয় মেনে চলতে হয়। আর তাই এই লেনদেন পদ্ধতিকে আমরা ৩টি ভাগে ভাগ করে নিতে পারি।

১। ওয়ালেট : যে স্থানটাতে বিটকয়েন জমা থাকে তাকে মূলত বলা হয়ে থাকে ওয়ালেট। ওয়ালেট অনলাইন বা অফলাইন দু’ধরনেরই হয়ে থাকে। এই ওয়ালেট থেকে একজন পিয়ার আরেকজনকে বিটকয়েন পাঠিয়ে থাকে। আর সুরক্ষার জন্য প্রতিটি ওয়ালেট এর জন্য একটি ইনক্রিপ্টেড ঠিকানা থাকে।

আরো পড়ুনঃ  স্যাটেলাইট কি ? স্যাটেলাইট সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন!!

২। ব্লকচেইন : বিটকয়েন আদান প্রদানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দরকার হয় না এটা ঠিক। তবে লেনদেনের ইতিহাস বা মূল তথ্যটুকু জমা রাখা হয়। বিটকয়েন এর এই তথ্য রাখার প্রক্রিয়াকে মূলত ব্লকচেইন প্রসেস বলা হয়ে থাকে।

৩। মাইনিং : একটি বিটকয়েন বৈধ কি না তা মূলত লিপিবদ্ধকরণ করা হয়ে থাকে মাইনিং এর মাধ্যমে। যারা করে তাদের মাইনার বলে। আর এই মাইনিং এর মাধ্যমেই অনেকে বিটকয়েন উপার্জনও করে থাকেন।
বিটকয়েনের ক্ষেত্রে এই তিন পদ্ধতিই মূলত প্রধান।

বিটকয়েনের একাল সেকালঃ

বিটকয়েন পৃথিবীতে আসার খুব বেশিদিন হয়নি। তাই একাল সেকাল বলতে খুব একটা পরিবর্তন তুলে ধরা যাবে না। তারপরও প্রায় অনেক পরিবর্তনই চোখে পড়ে। শুরুর দিকে যখন বিটকয়েনের আবির্ভাব ঘটে তখন এর খুব বেশি হৈচৈ ছিল না। একটু উপরেই বলেছি ১২৫০ টি বিটকয়েনের বিনিমিয়ে এক ডলার পাওয়া যেত। তার মানে ধরেই নেয়া যায় এর কতটুকু অবহেলায় ছিল সেকালে। কিন্তু এখন তার পরিস্থিতি কি?

>এখন কি বলা হচ্ছে জানেন?

৪৪ লাখ টাকায় এখন একটি বিটকয়েন কিনতে হচ্ছে। শুধু তাই কিন্তু নয় বলা হয়েছে টেসলার একটি গাড়িও নাকি কেনা যাবে এই বিটকয়েন দ্বারাই। ভাবতে পারছেন সেই বিটকয়েন এখন কিরূপ নিয়েছে? আর বলাই যায় বিটকয়েনের একাল চলাকালে আরও কত কি ঘটতে পারে। শুধু ভাবাতেই চাই আপনাকে।

বাংলাদেশে বিটকয়েন

বিটকয়েন বাংলাদেশেও তুমুল সারা ফেলেছে। তবে সেই প্রসেস শুধুমাত্র গোপনেই চলছে। বিশেষ করে যারা ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং এর সাথে জড়িত তাদের কেউ কেউ এই কথা বলে থাকেন যে তারা বিটকয়েন লেনদেন করেন। আর আপনি চাইলেও সামনাসামনি তা আনতে পারবেন না। আর এই প্রসেসটার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কেন্দ্রিয় ব্যাংক থেকে মূল হুমকিটা এসেছে। ২০১৭ সালে ঘোষণা করে এই বিটকয়েন আদান প্রদানকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়।

আর কেউ যদি এমন কিছু করতে গিয়ে ধরা পরে তবে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানানো হয়। বলা যায় বাংলাদেশে এখনও সেভাবে তা লিগ্যাল জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে এখানে একটি বিষয় তা হলো সেটা ছিল ২০১৭ সালের কথা। এখন পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হচ্ছে। পুরো বিশ্বের ক্ষেত্রেও সেই একই বিষয়। ভবিষ্যতের পুরো বিশ্বের মতোই এর দাম দেশেও অনেক বাড়বে এটাই আমাদের কাম্য।

পরিশেষে –

বিটকয়েন এখন এক ভার্চুয়াল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও করে নিয়েছে এক বিশাল অবস্থান। চাইলে আপনিও এই পরিস্থিতির সাথে যুক্ত হতে পারেন খুব সহজেই। তবে আপনাকে অবশ্যই ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হবে। কেননা বিটকয়েন মাইনিং এর ক্ষেত্রে বিশাল কোডিং করতে হয়। ইউনিক কোড বের করতে হয়। তাই যদি মাইনিং এ আসতে চান তবে আপনাকে একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে আর তা হলো ধৈর্য্য ধরতে হবে। সেই সাথে অনলাইন সুরক্ষার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

সর্বোপরি এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আজকে আপনার সামনে হাজির করেছি। আশা করি বিটকয়েন কি এবং বিটকয়েন এর সকল কিছু সমন্ধে আপনার প্রাথমিক বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। এরপরও আরও কিছু জানার থাকলে তা কমেন্টবক্সে লিখুন। আমাদের পূর্ববর্তী আর্টিকেলের আপডেট দেখুন – বিশদ

You May Also Like

বিশদ স্টাফ

About the Author: বিশদ স্টাফ

হ্যালো,আমি বিশদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!