ড্রোন কি? কিভাবে ড্রোন কাজ করে?

দুর্যোগপূর্ণ এক এলাকায় কিছু লোক আছে। এখন আপনাকে দায়িত্ব দেয়া হলো তাদেরকে সুরক্ষিতভাবে উদ্ধার করার। কিন্তু আপনি তখন পড়ে গেলেন দোটানায়। ভাবছেন যদি উড়জাহাজ দিয়ে তাদের উদ্ধার করার চেষ্টা হয় তাহলে একজন পাইলটের জীবনকে হুমকির মুখে রাখতে হচ্ছে। আবার না পাঠিয়েও উপায় নেই। এমতাবস্থায় কি করবেন তা যদি খুজে না পান তবে ড্রোন নামক এই জিনিসটি হতে পারে আপনার বিকল্প সমাধান। হ্যা,বিস্ময়েরও বিস্ময় এই ড্রোন এর সেই জানা ও অজানা কিছু তথ্য নিয়েই আজকে আমাদের আলোচনা। বিশদের আজকের পর্বে আপনাকে স্বাগতম

ড্রোন কি?

অ্যাভিয়েশন ও স্পেস এর দিক থেকে ড্রোনকে একটি পাইলট বিহীন বিমান হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। প্রযুক্তির একটি ছোট্ট ভাষায় যাকে UAV অর্থাৎ Unmanned Aerial Vehicle হিসাবে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। সচরাচর ড্রোন বলতে আমরা যে ছোট্ট প্লেনটিকে বুঝাই শুধু তাই কিন্তু ড্রোন নয়। বরং অনেক বড় একটি বিমানও ড্রোন হতে পারে। বলা হয়ে থাকে – ড্রোন যেমন বিমানের মতোই বড়, তেমনি হাতের তালুর চেয়েও ছোট। এটি দ্বারা মূলত সব প্রকার ড্রোনকেই বোঝানো যায়। ড্রোনকে রোবোটিক্স ও ইলেকট্রনিক্স এর সর্ব উন্নত প্রযুক্তি হিসাবে অ্যাখ্যায়িত করা হয়।

ড্রোন কেন ব্যবহার করা হয়?

সচরাচর আমাদের চোখে যে ড্রোনগুলো পড়ে তা মূলত আকারে অনেকটাই ছোট এবং বাচ্চাদের খেলনা হিসাবেই প্রকাশ পায়। কিন্তু খেলনাতেই কি এর ব্যবহার শেষ? না মোটেও নয়। এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এর ব্যবহারের পরিসরও বৃহৎ। বিমানের সাইজের ড্রোন মূলত দূরবর্তী স্থান হতে ভারী মালামাল পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। আর এর ব্যবহার প্রকট হয় ঠিক তখন যখন কোনো একটা দুর্যোগপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদে নিয়ে আসার প্রয়োজন পড়ে। এর মাধ্যমে কোনো পাইলটের জীবনকে আশংকায় না ফেলেই মানুষকে উদ্ধার করা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি যে ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহৃত হয় তা হলো সামরিক ক্ষেত্র।

আর ছোট্ট ড্রোনগুলো খেলনার পাশাপাশি শোভা পায় বিভিন্ন ফটোগ্রাফারের কাছে। এর মাধ্যমে তারা উপর হতে ছবি তুলতে পারে। আর এভাবেই মানুষের নানা মুখে চাহিদাকে একাই বিভিন্নরূপে পূরণ করে যাচ্ছে ড্রোন। যার শত শত উদাহরণ আমাদের সামনেই।

ড্রোন কবে আবিষ্কার হয়?

আজকাল আমরা ড্রোন বলতে যা বুঝি তার মূল শুরুটা হয় ১৯১৬ সালে। স্যার নিকোলাস টেসলা প্রথম এই পাইলট বিহীন এয়ারক্রাফট এর ধারণা দেন। আর তার সুত্র ধরেই প্রথম ড্রোন চালু করা হয় ১৯১৭ সালে। যা ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার করেছিল। ব্রিটেনের এই ড্রোনটি ছিল রেডিও দ্বারা পরিচালিত এবং ১৭ সালের মার্চ মাসেই তা চালু হয়। অপরদিকে আমেরিকার কেটারিং বাগ নামে ড্রোনটি প্রথম আকাশে উড়াল দেয় ১৯১৮ সালের অক্টোবর মাসে। উভয় ড্রোনই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের ক্ষমতার যথাযথ পরিচয় দেয়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মাঝখানের সময়টাতে ড্রোনকে আরো বেশি কার্যকর বানানোর পিছনে কাজ চলতে থাকে।

আর এরই সুত্র ধরে ১৯৩৫ সালে ব্রিটেন রেডিও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একাধিক ড্রোন আবিষ্কার করে। আমেরিকাও উক্ত সময়টিতে ড্রোন কার্যকর এর পিছনে কাজ করতে থাকে। তবে তাদের ড্রোন এর ব্যবহার এই সময়টিতে ছিল শুধু টার্গেট প্রাকটিস করার জন্য। আর এটাই ছিল প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ড্রোনের আবিষ্কার ও ব্যবহার।

আর এই অতি কার্যকর ড্রোনগুলোর প্রথম প্রয়োগ কোথায় হয় জানেন? এদের প্রথম ব্যবহার করা হত ভিয়েতনাম যুদ্ধে। এরপর তা আস্তে আস্তে আরো কয়েকটি যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। আর ড্রোন এর শুরুর ব্যবহারগুলা কিছুটা এমনি ছিল। অর্থাৎ প্রথমদিকে তা শুধু সামরিক কাজেই ব্যবহৃত হতো। তবে তারপর আস্তে আস্তে এর ব্যবহারের প্রসার আরো বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে যে ড্রোন দিয়ে আমরা খেলে থাকি বা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করে থাকি তাকে মূলত হবি ড্রোন বলা হয়।

আর তা ২০১৩ সাল পর্যন্ত কারোর কল্পনাতেও আসেনি। ২০১৩ সালে অ্যামাজন যখন এটি সম্পর্কে একটি নোটিশ জারি করে তখন সবাই তা সম্পর্কে জানতে পারে ও মানুষ তা ব্যবহারে উৎসুক হয়। আর এভাবেই এখন তা নানাবিধ কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যার শত শত ব্যবহারিক আমাদের সামনে আছে।

ড্রোন কিভাবে কাজ করে?

হাতে একটা জয়স্টিক নিয়ে এবং জিপিএস ব্যবহার করে একটা ড্রোন চালাতে আপনার কিছুটা গেম খেলার মতোই লাগবে। আর তাই ড্রোন দিয়ে খেলতে অনেকেই ভালোবাসে। যাই হোক সরল সিধে ড্রোনের পিছনে অর্থাৎ এর ভিতরের বিষয়গুলো কিন্তু একটু জটিল। একটি ড্রোনের ভিতর আপনি যে জিনিসগুলো দেখতে পাবেন তা হলো একটি অ্যাক্সিলোমিটার, একটি জাইরোস্কোপ ও অন্যান্য কিছু অংশ। আর এগুলো সম্মিলিতভাবে একটি ড্রোনকে উড়াতে সাহায্য করে।

তবে প্রশ্ন হলো এই অংশগুলো কাজ কিভাবে করে, তাই না? আসলে এর কাজ করার পেছনে একটুখানি পদার্থবিজ্ঞান আপনি খুজে পাবেন অর্থাৎ পদার্থবিজ্ঞানের সুত্রের ব্যবহার। ড্রোন টেকনোলজি মূলত খুবই হালকা রকমের পদার্থ দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে। আর এই হালকা পদার্থগুলোই ড্রোনকে অতি উচ্চতায় উড়তে সাহায্য করে। তবে একটি ড্রোন মূলত কয়েকটি ধাপে কাজ করে –

কানেক্টিভিটিঃ

প্রথমেই যা আসে তা হলো কানেক্টিভিটি। হ্যা, ড্রোন তার তারবিহীন সংযোগ এর জন্যই দূর থেকে কোনো স্মার্টফোন বা ট্যাব দ্বারা পরিচালিত হতে সক্ষম। এই তারবিহীন সংযোগ একজন পাইলটকে দূরে থেকেই ড্রোন ও তার আশেপাশের পরিবেশের উপর নজড় রাখার ক্ষমতা দেয়। আর ড্রোনের জিপিএস সংযোগ এর কারণে এর জন্য কেবল একটি নির্দিষ্ট পথ ঠিক করে দেয়া যায়।

রোটার ব্যবহার করে উড়া ও ডানে বায়ে মোড় নেয়াঃ

ড্রোনগুলো যে আকাশে ভেসে থাকে বা উড়ে তার পিছনে মূল কাজটা কিন্তু রোটারের। আসলে রোটার অভিকর্ষের বিরুদ্ধে সমান বল প্রয়োগ করে এটিকে উপরে রাখে। আর ড্রোনে থাকা ৪টি রোটার এর ভিতর ২টি ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরতে থাকে যাতে ড্রোনটি উড়তে পারে। বাকি দুটো রোটার এর পাশের বল এর ভারসাম্য রাখতে কাজ করে।

অ্যাক্সেলেরোমিটার এবং অ্যালটিমিটার:

অ্যাক্সেলেরোমিটার মূলত ড্রোনের বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করে থাকে যেমন ড্রোনটি কত স্পিডে উড়ছে বা কোন ডাইরেকশনে চলছে। অপরদিকে অ্যালটিমিটার মূলত ড্রোনটি কত উচ্চতায় উড়ছে সেই তথ্য সরবরাহ করে। এর মাধ্যমে খুব সহজেই ড্রোনকে নিরাপদে মাটিতে ফিরিয়ে আনা যায়।

ড্রোন ক্যামেরা :

কিছু কিছু ড্রোনে বিল্ট-ইন ক্যামেরা থাকে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় ড্রোনটি কোন স্থানে উড়ছে। এছাড়াও ড্রোন যদি কোনো স্থানে ডাইরেক্ট লাইন ছাড়াই উড়তে থাকে তবে তাও নির্ণয় করা যায়। অনেকেই আবার এই ক্যামেরা ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানের ছবি তোলার জন্য। কেউ কেউ আবার ভিডিও এর কাজেও এটি ব্যবহার করে থাকে। তাছারা বর্তমান সময়ে সকল সিনেমা তৈরি করার ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করে ভিডিও ক্যাপচার করে থাকে।

ড্রোন ব্যবহারের সুবিধা কি কি?

ধরুন আপনার বাড়িতে রাতে চুরি হওয়ার সম্ভবনা খুব বেশি। এখন আপনাকে প্রতিদিনই রাত জেগে তাই পাহারা দেয়া লাগছে। তবে কেউ যদি আপনার হয়ে এই কাজটি করে দিতো তাহলে অনেক উপকৃত হতেন তাই না? হ্যা, ড্রোন এই দিন রাত্রি ২৪ ঘণ্টার নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত হয় সামরিক ক্ষেত্রে। তবে এর ব্যবহারের বা সুবিধার এখানেই কিন্তু শেষ নয়। কেননা এর কাছে আপনি পাচ্ছেন বহুমুখী সুবিধা সমূহ। চলুন জেনে আসি –

সামরিক ক্ষেত্রে:

ড্রোনের সৃষ্টি যেহেতু সামরিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল, তাই এর বেশির ভাগ ব্যবহার সামরিক কেন্দ্রিক। অনেক দেশেই এই ড্রোনকে ২৪ ঘন্টা পাহারা দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। অনেক দেশের মিলিটারিই আবার তাদের টার্গেট অনুশীলনের জন্য এই ড্রোন ব্যবহার করে থাকে।

পণ্য ডেলিভারী:

হ্যা, ঠিকই শুনেছেন। ডেলিভারি এর কাজে এই ড্রোন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর এর প্রচলন শুরু হয় আমাজনের হাত ধরে ২০১৩ সালে। তারা এই ড্রোনের মাধ্যমে দূর দূরান্তে মালামাল বা প্রোডাক্ট পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করে। বর্তমানে তাদের দেখেই আরো অনেকেই এই ব্যবস্থাকে আপন করে নিয়েছে।

দূর্যোগপূর্ণ স্থান থেকে মানুষকে উদ্ধার:

দূর্যোগপূর্ণ স্থান থেকে মানুষকে উদ্ধারের জন্য ড্রোন হলো একটি অনন্য সমাধান। বলতে পারেন উড়োজাহাজ থাকতে ড্রোন কেন ব্যবহার করব? হ্যা, সেটাই কেন ব্যবহার করবেন। আসলে এখানে যেহেতু জীবন বাচানোর কথা বলা হচ্ছে তো সবার জীবনের মূল্যটাই আপনার কাছে বেশি হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে আমি যদি উড়জাহাজের কথা চিন্তা করি তবে তার জন্য আমাকে একজন পাইলট পাঠাতে হবে। এতে করে আপনি তার জন্যও এক হুমকি দাড় করিয়ে দিলেন। তবে আপনি যদি ড্রোন ব্যবহার করেন তাহলে কিন্তু আপনাকে কোনো মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে হবে না।

পরিশেষে ড্রোন এর মতো টেকনোলজি মানুষের জীবনকে করেছে আরো স্বাছন্দ্যময়। সেই সাথে যোগ করেছে কিছু বাড়তি সুবিধা। আর আমাদের যথাযথ প্রয়োগের মাঝেই এর সার্থকতা লুকিয়ে আছে। তাই আমরা যদি এর যথাযথ ব্যবহার করতে পারি তা হলেই আমাদের প্রযুক্তির ব্যবহার সার্থক বলে পরিগণিত হবে।

আসাকরি আমার এই আর্টিকেল থেকে ড্রোন সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানতে পারেছেন। ড্রোন সম্পর্কে আরো কিছু প্রশ্ন থাকলে আমাকে জানাতে পারেন।

You May Also Like

মোঃ আনছের আলী

About the Author: মোঃ আনছের আলী

ছোটবেলা থেকেই আকৃষ্ট প্রযুক্তির উপর। ২ জি"র আমল থেকে জাভা বাটন ফোন থেকে ইন্টারনেটে কনটেন্ট ব্রাউজিং শুরু। প্রযুক্তি যতটা আমাকে কাছে টেনে নিয়েছে। হয়তো অন্য কিছু আমাকে এতটা কাছে নিতে পারেনি। ভালোলাগে কঠিন জিনিসের সহজ ব্যাখ্যা করতে।

4 Comments

  1. লেখাটি ভাল হয়েছে।😍😍😍 তবে প্রতিদিন নতুন আর্টিকেল দেওয়া উচিত।

    1. ধন্যবাদ ভাইজান। আশাকরি আপনাদের জন্য আরো দ্রুত আর্টিকেল লিখার চেষ্টা করবো। সাথেই থাকবেন।

  2. ধন্যবাদ <3 অনেক কিছু জানা হলো…
    প্রতিদিন এমন লেখা চাই

    1. অবশ্যই আরো ভালো ভালো আর্টিকেল সামনে আসছে!! আমাদের সাথেই আশাকরি নিয়মিত থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: